ইন্দোনেশিয়ার টফু কারখানার প্রধান জ্বালানিতে রূপ নিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জাপান, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা প্লাস্টিক বর্জ্য। পূর্ব জাভার একটি গ্রামের পাঁচটি টফু কারখানার মালিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন ইকোটন সম্প্রতি জানিয়েছে, বিদেশ থেকে আসা প্লাস্টিক প্রতিদিন পোড়ানো হচ্ছে এখানকার কারখানায়, যা ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
খাবার হিসেবে পূর্ব এশিয়ায় টফু বেশ জনপ্রিয়। এটি সাধারণত সয়া মিল্ক থেকে তৈরি হয়। প্রতিবেদন অনুসারে, পূর্ব জাভার প্রায় ৬০টি টফু কারখানায় চুল্লি ও ভাজাভাজির সরঞ্জামে কাঠ ও নারকেলের খোলের পাশাপাশি প্রধান জ্বালানি হয়ে উঠছে প্লাস্টিক বর্জ্য।
এ অঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় ৬০ টন টফু উৎপন্ন হয়, যা স্থানীয় বাজার ও ইন্দোনেশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সুরাবায়াসহ আশপাশের অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। এসব টফু বিদেশে রফতানি করা হয় না।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক কারখানা মালিক বলেন, ‘প্লাস্টিক ব্যবহার করি কারণ এটা সস্তা।’
ইন্দোনেশিয়ায় প্রকাশ্যে বর্জ্য পোড়ানো নিষিদ্ধ হলেও এটাই দেশজুড়ে বর্জ্য নিষ্পত্তির প্রচলিত উপায় হয়ে উঠেছে। ট্রপোডোর একটি কারখানায় দেখা গেছে, ঘরোয়া প্লাস্টিক বর্জ্য ও স্থানীয় একটি জুতার কারখানার রাবারের ভাঙা টুকরোর পাশাপাশি পড়ে আছে বিদেশী প্লাস্টিকের স্তূপ।
ওয়াহিউনি নামের এক কারখানা মালিক জানালেন, তারা প্রতি দুদিনে এক ট্রাক প্লাস্টিক পোড়ান। এর খরচ পড়ে মাত্র ১৩ ডলার। অথচ একই পরিমাণ কাঠ কিনতে হলে খরচ হয় ১৩০ ডলার।
ইন্দোনেশিয়ার সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা (বিপিএস) অনুসারে, দেশটির মানুষ গড়ে বছরে আট কেজি টফু খায়। কিন্তু প্রোটিনসমৃদ্ধ এ খাদ্যের উৎপাদন নিয়েই উদ্বেগ প্রকাশ করছে পরিবেশবাদী সংগঠন ইকোটন। সংগঠনটির ড. দারু সেটিওরিনি বলেন, ‘পুনর্ব্যবহারের অযোগ্য প্লাস্টিক স্ক্র্যাপ শিল্পে বিশেষ করে টফু উৎপাদনে জ্বালানি হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। মূলত কাগজকল থেকেই আসে এসব সস্তা ও বিপুল পরিমাণ বর্জ্য। ধনী দেশগুলোর বর্জ্য খুঁজে পাওয়া খুব সহজ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার।’
ড. সেটিওরিনি জানালেন, ইন্দোনেশিয়ায় কাগজ আমদানির মাধ্যমে আসে বেশির ভাগ বিদেশী প্লাস্টিক। ইন্দোনেশিয়া প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ টন স্ক্র্যাপ কাগজ ও কার্ডবোর্ড আমদানি করে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান এ খাতের প্রধান রফতানিকারক।
ইন্দোনেশিয়া কাগজ আমদানির ক্ষেত্রে ২ শতাংশ ‘দূষণ সীমা’ নির্ধারণ করলেও ইকোটনের দাবি, বাস্তবে অনেক চালানে এ মাত্রা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। এ অতিরিক্ত প্লাস্টিক কাগজকলে কোনো কাজে লাগে না। ফলে তা স্থানীয় দালালদের কাছে বিক্রি বা বিনামূল্যে বিলি করে দেয়া হয়। ইকোটনের অনুমান, প্রতি সপ্তাহে ট্রপোডোর টফু কারখানায় প্রায় ৭০ টন প্লাস্টিক পোড়ানো হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্লাস্টিক পোড়ালে তা খাদ্য উৎপাদনে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘমেয়াদি অসুখ এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইকোটন ট্রপোডোর বাজার থেকে টফুর নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে। সেখানে দশমিক ১৫ মিমি থেকে ১ দশমিক ৭৬ মিমি আকারের মাইক্রোপ্লাস্টিক ফাইবার পাওয়া যায়। প্লাস্টিক পোড়ালে বাতাস, পানি ও পৃষ্ঠে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়ে, যা খাবারে প্রবেশের আশঙ্কা বাড়ায়। মুরগির মাধ্যমে এ দূষণ খাদ্যচক্রেও ছড়াচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা।
২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, টফু কারখানার আশপাশের এলাকায় মুরগির একটি ডিম খেলেই দেহে গ্রহণযোগ্য ডাই অক্সিনের মাত্রা ৪৮ গুণ ছাড়িয়ে যায়। ডাই অক্সিন শিশুদের বৃদ্ধি, প্রজনন সমস্যা, গর্ভপাত, ইমিউন দুর্বলতা ও হরমোনে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ার পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক নোভরিজাল তাহার স্বীকার করেছেন, এটি মানব স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক। তবে সরকার এখন কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে কাজ করছে বলে তিনি দাবি করেন।
কিন্তু ইকোটনের ড. সেটিওরিনি বলছেন, শুধু এ নিষেধাজ্ঞাই যথেষ্ট নয়। আসল সমস্যা হলো ধনী দেশগুলো গরিব দেশগুলোয় তাদের বর্জ্য ফেলে দিয়ে যাচ্ছে। এটিই হচ্ছে বর্জ্যের উপনিবেশবাদ।